টেলিটক

দেশীয় পন্য, কিনে হই ধন্যঃ টেলিটক ভোগান্তী সমগ্র

বেশ কিছুদিন আগে আমার গ্রামীনফোন তথা হারামীফোন ব্যাবহারের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলাম। এবার বলি টেলিটক ব্যাবহারের অভিজ্ঞতা। যতটুকু পেরছি, শর্ট করে বলার চেষ্টা করেছি।

টেলিটক ভোগান্তী ১
সাল মনে নাই। পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম নতুন এক মোবাইল অপারেটর আসছে, নাম টেলিটক। বিটিটিবি (বর্তমান বিটিসিএল) এর তত্বাবধায়নে। টিএনটি তে ফোন করতে আর কোন এক্সট্রা চার্জ লাগবে না। ওয়াও! কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সবাই পাবে না এর সীম। লটারির মাধ্যমে দেয়া হবে। দাম আবার ৫০০০ টাকা। ইচ্ছে হারিয়ে গেল।

টেলিটক ভোগান্তী ২
২০০৭। মাত্র মেট্রিক পরীক্ষা শেষ। পহেলা বৈশাখের মেলায় নিশ্চিন্তে ঘুরে বেরাচ্ছি আমি ও সাথে এক বন্ধু। এটা ওটা দেখচ্ছি। চোখ গেল টেলিটক এর স্টলের দিকে। ৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে সীম। মাথাই নষ্ট। ১০০ টাকার বিনিমিয়ে কিনে নিলাম একখানা সীম কার্ড। খুশির চোটে ১টাকা ফেরত দিতে মনে নাই। মনে হচ্ছিল ৫০০০ টাকার লটারি জিতেছি।

টেলিটক ভোগান্তী ৩
সীম কেনার পর বাসায় আসার জন্য ছটফট করচ্ছিলাম। দেশপ্রেম উপচিয়ে পরচ্ছিল। আর জিপি নয়, আজ থেকে দেশের টাকা দেশে। থাকতাম টাংগাইল শুপারি বাগান এলাকায়। সন্ধার আগেই বাসায় এসে সীম কার্ড খুব যত্নে ভেঙ্গে মোবাইলে লাগালাম। কিন্তু একি, নেটওয়ার্ক যে নাই। দেশের টাকা দেশে রাখা সম্ভব হলো না, হতাশার সাথে নিজের টাকা নরওয়ে তে পাচার করা শুরু করলাম। মনে মনে খুব গালাগালি।

টেলিটক ভোগান্তী ৪
সাল ২০১১। সবেমাত্র পোলাপানের ইন্টারের রেজাল্ট হয়েছে। পরিচিত একজনের টেলিটক সীম দরকার। ১টা সাবজেক্ট এর জন্য এ প্লাস আসেনি, সেটা চেলেঞ্জ করবে। দিলাম সীম। রিচার্জের পর দেখতে পেলাম, নেয়াদ ২০১২ সাল পর্যন্ত। অথচ কেনার সময় বলা হয়েছিল ২০২০ সাল পর্যন্ত মেয়াদ। তখন মেয়াদ ফেক্ট ছিল। এখন ফেক্ট না, তাই বলে মেয়াদ কমিয়ে দেয়া কি প্রতারণা না? যাই হোক, টেলিটকের এই সার্ভিসে সবাই খুশি। এতদিনে একটা ভালো কাজ করেছে টেলিটক।  নির্দিষ্ট কোড লিখে এসএমএস করার পর আরেক সমস্যা। কোন ফিরতি মেসেজ আসে না, পরে কেয়ারে ফোট টোন করে অনেক হিস্কির পরে সমাধান পাওয়া গেল। দেশপ্রেম ফুটা হয়ে গেল আমাদের।

টেলিটক ভোগান্তী ৫
সাল ২০১২। বন্ধুর বোন কলেজে ভর্তি হবে। টেলিটক সীম দরকার। দিলাম সীম। কিন্তু নতুন সমস্যা দেখা দিল। একবার টাকা দেখায় ঠিকই আছে, আরেকবার শূন্য। পরে জানতে পারলাম নেটওয়ার্ক আপগ্রেড চলচ্ছে। ভর্তি হতে সমস্যা হয়নাই। নেটওয়ার্ক পেইন শুধু। ব্যাপার না।

টেলিটক ভোগান্তী ৬
সাল ২০১৩ জানুয়ারি। থ্রিজি নেয়ার জন্য ছটফট করচ্ছি আমি। গাজীপুরে থ্রিজি পাওয়া যাচ্ছে। বন্ধুদের মাঝে তখনও কেউ ব্যাবহার করেনি থ্রিজি। সীমের অনেক দাম। এরই মাঝে এক অফার এলো, যারা ৩১ ডিসেম্বরেও সীম ব্যাবহার করেননি তারা ২০০ টাকা রিচার্জ করলে ফ্রি থ্রিজি মাইগ্রেশন। দ্রুত ২০০ টাকা রিচার্জ করলাম, এসএমএস করলাম। একি! কোন রিপ্লাই আসে না। আরো টাকা রিচার্জ করে ৭৫০ টাকা দামের একটা প্যাকেজ কেনার চেষ্টা করলাম থ্রিজির। আয় হায়, টাকা কাটছে ঠিকই কিন্তু নেট এক্টিভ হয় না, থ্রিজি আইকনও (3G/H/H+) আসে না। এজ (EDGE/E) এর এইকনও আসে না। কেয়ারে ফোন দিলাম। কেও ফোন ধরে না। ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়েটিং থাকলাম কেয়ারে। বহু টাকা নষ্ট। শেষে ফেসবুকের এক পেজের মাধ্যমে জানতে পারলাম কাষ্টমার কেয়ার নাকি বন্ধ আছে! আজিব না? বালের সার্ভিস।

টেলিটক ভোগান্তী ৭
জানুয়ারি, ১৩ ব্যাক্তিগত ভাবে টেলিটকের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন চালাচ্ছি আমি। বন্ধু বান্ধব, পরিচিত,  আত্নীয় দের জানাচ্ছি আমার সমস্যার কথা। সবাইকে বিরক্ত করে তুলচ্ছি টেলিটকের বিরুদ্ধে। কয়েকদিন এভাবে প্রচারণার পরে একজনের কাছে ৪টা নাম্বার পেলাম টেলিটকের। জানতে পারলাম এগুলাতে ফোন দিলে নাকি সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়। অফিস আওয়ারে ফোন দিতে হবে। যাই হোক, খুবই এক্সাইটেড আমি। রাতে ঘুম আসে না। সকাল ৯টায় কাষ্টমার কেয়ারে ফোন দিতে হবে যে। থ্রিজি! বলে কথা।

টেলিটক ভোগান্তী ৮
সকাল ৯টায় ফোন দিলাম কেয়ারের একটি নাম্বারে। নাহ কেও রিসিভ করলো না। বার বার ট্রাই করতে থাকলাম। ফোন দিতে দিতে দুপুর ২টা। ততক্ষনে আমরা ৩ বন্ধু একত্রে বসে একেক নাম্বাতে ট্রাই করে যাচ্ছি। নাম্বার গুলো মাঝে মাঝেই ব্যাস্ত পাচ্ছিলাম, আরো অনেকেই যে ট্রাই করে যাচ্ছিল তা স্পষ্ট বোধগম্য।  দুপুর ৩টার দিকে ক্লান্ত হয়ে এসএমএস দিলাম,

“প্রিয় কাষ্টমার ম্যানেজার ভাই, আপনি ফ্রি হইলে আমাকে মিসকল দিয়েন। জরুরী কথা আছে”

টেলিটক ভোগান্তী ৯
পরের দিন সকালে আবার শুরু। ১১টার দিকে হঠাৎ কেউ একজন ফোন ধরল। আমি আনন্দে লাফ দিয়ে উঠে কথা বলা শুরু করলাম। একলোক ফোন ধরলো, তাকে সব খুলে বলার পর তিনি খুব বিরক্ত হয়ে আরেকটা টেলিটক নাম্বার দিয়ে বল্লেন, সেই নতুন নাম্বার ফোন দিয়ে সমস্যার কথা বলতে। কি আর করা, বুক ভরা হতাশা মনে নিয়ে সেই নাম্বারে ফোন দিলাম। দেরী হলো না। কয়েকটা ফোন দিতেই রিসিভ করলো। তিনি একজন নারী। বয়স অনুমান করা সম্ভব না, কিন্তু তার ব্যাবহার এমন ছিল যে, আমার মিনে হচ্ছিল উনাকে আমি অনেকদিন যাবৎ ফোনে ডিস্টার্ব করি, প্রেম করতে চাই ইত্যাদি ইত্যাদি। তাকেও আমার সব ঝামেলার কথা খুলে বলতে হলো।
সল্যুশন পেলাম, সীম রিপ্লেস করতে হবে। থ্রিজিতেও মাইগ্রেট হয়েছে। এসএমএস যে আমি পাই না, এগুলা তিনি বিশ্বাস করেন না। বল্লেন সীম রিপ্লেস করলে সমস্যা ঠিক হতে পারে, নাহলে অন্য ব্যাবস্তা করা হবে। রিপ্লেস পয়েন্ট পেলাম টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস)।

টেলিটক ভোগান্তী ১০
এক বন্ধুকে অনেক বুঝিয়ে আমার সাথে পরের দিন সকালে সীম তুলতে যাওয়ার জন্য রাজি করালাম। প্রায় দেড় ঘন্টার রাস্তা। এর মাঝে ১ঘন্টা বাস জার্নি। যাওয়া আসা ৩ ঘন্টা মিনিমাম। অনেক কষ্টে পৌছালাম সেখানে। ওমা! কেয়ার যে বন্ধ! অথচ আমি তো ফোনে নিশ্চিত হয়েই এসেছি। কেয়ারের ৪টা সাটারের একটা অর্ধেকের কম খোলা ছিল। কি মনে করে যেন অভদ্রের মতই মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দিলাম ভেতরে। ভেতরে আলো জলচ্ছে। এক ছেলে জিজ্ঞাসা করল, কি চাই। কখন খুলবে জানতে চাইলে সে বল্ল, কেয়ার খোলাই আছে। ভেতরে আসেন। মারাত্বক অবাক হলাম। আধাবসা হয়ে প্রবেশ করলাম ভেতরে। সুন্দরি এক মহিলা আমাকে সাহায্যের জন্য প্রস্তাব দিলেন। সীম টা রিপ্লেস করলাম। মাঝে অনেক হাউ কাউ। থ্রিজি সীম বলে ১০০ টাকা রেখে দিল আমার। যাই হোক, থ্রিজি বলে কথা। তাৎক্ষণিক সীম লাগিয়ে থ্রিজি ব্যাবহার করলাম। মনে হচ্ছিল ফোন আমার নষ্ট হয়ে গেছে। টেলিটকের উপর সকল ক্ষোভ যেন পানি হয়ে গেল।

টেলিটক ভোগান্তী ১১
ব্যাবহার শুরু করার পর সকল সমস্যা টের পেলাম। নেটওয়ার্ক থাকে না, এমনকি গাজীপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আশেপাশেও থ্রিজি নাই। ছাদে গেলে কোন রকম হালকা পাতলা পাওয়া যায়। এত কষ্টের পরও ৩ মাস ব্যাবহার করেছি আমি। সমস্যার সম্মুখীন হয়ে হয়ে দেশপ্রেম শেষ হয়ে গেছে আমার। টেলিটকের সার্ভিসের গুষ্টি কিলাই আমি। দেশের টাকা নরওয়েতে পাঠাতেই আমি এখন বেশি উৎসাহী। টেলিটকের মত বাটপারদের  সার্ভিস ব্যাবহার মানে, চোরকে চুরি করতে সাহায্য করা। টেলিটক থ্রিজি সত্যিই আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে দিয়েছে।


লাবিব ইত্তিহাদুল
২৩ সেপ্তেম্বর, ২০১৩

৭৪০৪ টি সর্বমোট হিট ৩ টি আজকের হিট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *