ধূপ পানি ঝর্ণা

কাপ্তাই মুপ্পোছড়া ও ধূপপানি ডায়েরী

ট্যুরে আমার টেনশনের উৎস হচ্ছে টয়লেট।
প্রকৃতি দেখতে যেয়ে প্রকৃতি কখন ডাক দিয়ে বসে, সেটা কিন্তু সত্যি টেনশনের বিষয়। এবারের ট্যুরেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি।
এবারের ধূপপানি, মুপ্পোছড়া, কাপ্তাই ইভেন্ট ছিল ভবঘুরে গ্রুপ এর সাথে, সেমি কমার্শিয়াল ইভেন্ট। কমার্শিয়াল ইভেন্ট এর মজা হচ্ছে কোন প্যারা নাই। একটা ফিক্সড এমাউন্ট আপনি দিয়ে দিবেন, যাতায়াত/থাকা/খাওয়া/গাইড/সিকিউরিটি এই ৫টা জিনিস তাদের দ্বায়ীত্বে।
আমাদের বাস ছিল গাবতলি থেকে সাড়ে ৮ টায়। সেই হিসাবে রাতের খাওয়া হয়েছিল আগে আগে, তার সাথে জ্যাম এ পরে ঢাকা ত্যাগ এর আগেই ক্ষুধা। ক্ষুধা নিবারণে যার শরণাপন্ন হলাম, তার নাম বাটারবন। খাওয়ার এক পর্যায়ে বাটার সাহেব জানান দিলেন ‘ইট’স লিটল লেইট’। চিন্তা না করে গিলে ফেললাম।
আমাদের সোলো গানের তালে ড্রাইভার ও তাল মিলিয়ে সকালের বদলে কাপ্তাই পৌছে দিলেন দুপুরে! এদিকে বাটার সাহেব পেটের ভেতর দিচ্ছেন হুক্কা হুয়া ডাক। আগে থেকে রিজার্ভ করা নৌকা নিয়ে ছুটল ভবঘুরে টীম বিলাইছড়ির পানে। পথে চোখ কানা করা সৌন্দর্য। একবার পাহাড় আর সবুজের দিকে তাকালে পলক ফেলতেও ইচ্ছা করবে না। কানা হয়ে যাবেন। ইভেন্ট এর পয়সা এখানেই উসুল।
বিলাইছড়ি নেমে দ্রুত বোর্ডিং এ ব্যাগ রেখে, হাল্কা ফ্রেশ হয়ে খাবার পার্সেল নিয়ে ছুটলাম মুপ্পোছড়ার দিকে। রাস্তায় ট্রলারের ছাদে বসে কাচা মেঘ দেখতে দেখতে ব্রাঞ্চ করা। ব্যাপারটা আনন্দদায়ক ছিল।
নৌকা থেকে নেমেই ট্রেকিং শুরু। ততক্ষনে প্রায় বিকাল, আর পাহাড়ের বিকাল আসলে সমতলের সন্ধ্যার মত। ফিরতি পথের কারো থেকে চেয়ে নিলাম বাঁশ। আজীবন হাটার পর অবশেষে পৌছেই গেলাম মুপ্পোছড়া ঝর্ণায়।

ঝর্ণা’র পিনিক টা এত মারাত্বক যে, আপনার এতদূর হাটার কষ্ট সে নিমিষে ভুলিয়ে দেবে। ওর মিঠ বেয়ে পরা পানিতে মাথা দিলে গ্লুকোজের মত রিচার্জ হয়ে যায় শরীর।
দ্রুত ঝর্ণা দেখে ফেরার পথ ধরলাম। মাঝপথে নামল আঁধার। আকাশে ঝিরঝির চাঁদ। এই আসে, এই ডুব দেয়। যেখানে নৌকা রেখে এসেছিলাম, তার কাছাকাছি এসে যা দেখলাম তা আজীবন মনে রাখার মত। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে হাজার হাজার জোনাকি। পিনিক চরে গেল মাথায়। ওরা যেন বলচ্ছিল, লাবিব, আজ রাত এখানেই থেকে যা।
তবুও জোনাকি’র ভালবাসা মাড়িয়ে আবার ট্রলারে চেপে ছুটলাম বিলাইছড়ির সেই নিরিবিলি বোর্ডিং এর দিকে। পথে সবাই বেশ ক্লান্ত। অনেকেই পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে নৌকার শরীরে। এর মাঝে আমরা কজন তীব্র বাঁশফাটা গলায় অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিলাম কাপ্তাই এর বুকে।
নৌকা ছেড়েই বোর্ডিং এর বাথরুমে গোসল সেরে গেলাম পূজো দেখতে সাথে হাল্কা পেট পূজো দিতে। মেনু ফিক্সড ছিল না। মেরে দিলাম জিলাপি আর পরটা। সেই জিনিস ছিল।
রাতের খাবারের আগে গল্প,আড্ডা,গান,তাস খেলা চলল আনলিমিটেড। কখন যে ১৯ জন অপরিচিত মানুষ একটা ফ্যামিলি হয়ে গেল, কেউ টের পেল না।
রাতে বেশ ঘুম না হলেও খুব আড্ডা হলো। পাশাপাশি আমার পেট ও বলে দিল অনেক কথা। সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে, বোর্ডিং চেক আউট করে সকালের নাস্তা খিচুড়ি ডিম নিয়ে ছুটলাম ধূপপানির সন্ধানে।

https://www.youtube.com/watch?v=528i6DvAq70

রাস্তায় দেখা হয়ে গেল আরেক ট্রাভেল গ্রুপ অপু নজরুল এর ইকোট্যুরিজম এর সাথে। একাধিক ট্যুর হয়েছে ওদের সাথে। দুএকজন কে পাওয়া ও গেল।
আগেই বলে দেয়া ছিল ৬ ঘন্টার ট্রেকিং। আমাদের এক সুপুরুষ ট্রেকিং এ যাওয়ার বদলে, আমাদের ব্যাগ পাহাড়া দেয়ার শপথ নিল। কেমন পাহাড়া দিল জানি না, তবে এক নারীর একটা প্যান্ট হাড়িয়ে গিয়েছিল, যার সম্পূর্ণ দোষ চাপানো হয় পাহারাদারের উপর। রাগে এক পর্যায়ে সে বলেই বসে, ‘আচ্ছা আমিই চুড়ি করছি প্যান্ট। বাসায় গিয়া ঐটা পইরা ঘুরুম ঠিক আছে?’। আমরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম।
যাইহোক, ধূপপানি যাত্রা শুরুতে আমি বেশ তরতাজা। নৌপথে মাত্র দুইবার গিয়েছি টয়লেটে। মানুষিক ভাবে তখনো ব্যাপক তাজা। ধূপপানি ট্রেকিং এর সময় বেশ যন্ত্রনা দিল প্রকৃতি। এত দূর্বল হলাম যে ধূপপানি পাড়ায় গিয়ে শুয়ে পরলাম মাটিতে। অজ্ঞান ই বলা চলে। জ্বর নিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড় উঠার সময় ও এই টাইপের টায়ার্ড ছিলাম, তবে এত নিস্তেজ হইনি কখনো।
শেষদিকের আগে হাল ছেড়ে দিলাম। আমার সাথে ছিল ফারিহা। একটা ঝিড়ি দেখে শুয়ে পরলাআবার। ফারিহা পানি দিয়ে দিচ্ছিল মাথায়। পাওয়ার ন্যাপ ভাল এনার্জি দেয়, সেটা আবার ও বুঝলাম।
মনে মনে ভাবলাম, যার কারণে ট্যুর টা মাটি হওয়ার চান্স ছিল, সে কিনা আমাকে মাথায় পানি দিচ্ছে আর আমি আধামরা! কারণ এটা ছিল ফারিহা’র প্রথম ঝর্ণা দেখা + প্রথম ট্রেকিং এ আসা। আমার থেকেও বেশি প্যারা খাচ্ছিল আমাদের ট্যুর এডমিন মেহেদি। বেচারা না পারতেছে আমাকে ছেড়ে যাইতে, না পারতেছে নিয়ে যাইতে। দ্বায়ীত্ব এক অদ্ভুত জিনিস।
ধূপপানি পাড়ায় অপুদের গ্রুপের (ইকোট্যুরিজম) থেকে লেবুর শরবত অনেকটা কেড়েই নিলাম। অমৃতের মত লেগেছিল। সেটাই যেন ইন্সটেন্ট এনার্জি দিল আমাকে। এর ১ মিনিট পরেই দোকান পেলাম। সেখানে পর্যাপ্ত স্যালাইন/শরবৎ গিলে আরো কিছুক্ষণ হেটে পৌছালাম সেই কুক্ষ্যাত ৬০ ডিগ্রি ঢালে। আনুমানিক ৬০ ডিগ্রি খাড়া নামতে হয়। এডমিন মেহেদী দড়ি নিয়ে যাওয়ায় ওঠা নামায় অনেক কম কষ্ট হয়েছে। নাহলে হয়ত অনেকে নামতেই পারতো না।
শেষ যেখানে দাঁড়িয়ে ধূপপানি কে দেখলাম, জোরসে বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল, প্রিয় ধূপপানি, আমি এতদূর আসলাম, তুমিও একটু আগাও। কিন্তু না, ব্যাপার টা মিলল না। প্রকৃতি বড় নিষ্ঠুর। সে ডাক দিলে আমরা সাড়া দিতে বাধ্য কিন্তু আমাদের ডাকে প্রকৃতি থোরাই কেয়ার করে।
ধূপপানি তে অনেক মজা করলাম। এত আনন্দ হচ্ছিল যে, এখন মনে হয় ওখানে কয়েক মুহূর্ত ছিলাম মাত্র। এই কয়েক মুহূর্তের সৃতি গুলো নিয়েই আমাদের অন্তরে বেঁচে থাকবে ধূপপানি। অন্তত যতদিন না আবার দেখা হয়।

১৫৫৮ টি সর্বমোট হিট ৫১ টি আজকের হিট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *